Dhaka , বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ:
Logo চতুর্থ দফায় স্বর্ণের মূল্যহ্রাস, ভরিপ্রতি দাম ২ লাখ ১৮ হাজার টাকা Logo নতুন শিক্ষাবর্ষে ৩১ কোটি বই ছাপাবে সরকার, নভেম্বরের মধ্যে বিতরণ শেষ করার লক্ষ্য Logo সালথায় সংঘাতের অবসান: অস্ত্র জমা দিয়ে প্রশাসনের ফুল পেলেন গ্রামবাসী Logo চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে ব্যাগ চুরি, মিরপুর-১০ এ হাতেনাতে ধরা পড়ল ৩ সদস্য Logo বিশ্বকাপ ফুটবলকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করেছেন Logo দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট ঘোষণা করা হবে আগামীকাল Logo সিলেটে বাড়ছে নদ-নদীর পানি,ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস Logo ফরিদপুরে জেলা পুলিশের মাসিক কল্যাণ সভা অনুষ্ঠিত: কৃতী পুলিশ সদস্যদের সম্মাননা প্রদান Logo আগামীকাল শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবলের মহারণ, নানা বিতর্ক ও অস্থিরতার মধ্যেও প্রস্তুত ফুটবল বিশ্ব Logo পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া ৭ লাখ টাকা প্রকৃত মালিকের কাছে হস্তান্তর করেছে শাহজাহানপুর থানা পুলিশ

সালথায় সংঘাতের অবসান: অস্ত্র জমা দিয়ে প্রশাসনের ফুল পেলেন গ্রামবাসী

ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় দীর্ঘদিনের গোষ্ঠীগত সংঘাত, কাঁচি-ঢাল আর টেঁটাযুদ্ধের সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে শান্তির পথে পা বাড়িয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অন্ধকার পথ ছেড়ে আলোর পথে ফিরে আসা এসব মানুষের শাস্তির ভয় দেখানোর পরিবর্তে বুকে টেনে নিয়েছে প্রশাসন। স্বেচ্ছায় দেশীয় অস্ত্র জমা দেওয়ায় তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে রজনীগন্ধার তোড়া।

​বুধবার (১০ জুন) বিকেলে সালথার মাঝারদিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে আয়োজিত এক ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানে গ্রামবাসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের ঘরে থাকা কয়েকশ দেশীয় অস্ত্র প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করেন। দীর্ঘদিনের জিঘাংসা ও কোন্দল ভুলে সমাজের শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার এই অনন্য উদ্যোগ জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

​সালথা এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার এবং তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের জন্য পরিচিত ছিল। তবে মাঝারদিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দারা এবার সেই কলঙ্কিত ইতিহাস মুঁছে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছেন।

​অনুষ্ঠানে দেখা যায়, গ্রামের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে যুবা-বৃদ্ধরা সারিবদ্ধভাবে এসে তাদের তৈরি করা ঢাল, সড়কি, টেঁটা, রামদাসহ বিভিন্ন মারাত্মক অস্ত্র প্রশাসনের কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। আর অস্ত্র জমা নেওয়া শেষে প্রশাসনের কর্মকর্তারা অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে তাদের ফুল দিয়ে বরণ করে নিচ্ছেন।

​বিগত দিনে যেখানে পুলিশের নাম শুনলেই আটকের ভয়ে গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে যেত, সেখানে সম্মান ও সামাজিক স্বীকৃতির মাধ্যমে মানুষকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলার এই মানবিক প্রয়াস উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে তোলে।

​সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাবলুর রহমান খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ফাতেমা ইসলাম।

​প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফাতেমা ইসলাম বলেন: ​”কেবলমাত্র কঠোর আইনি ব্যবস্থা দিয়ে অপরাধ দমন সম্ভব নয়, যদি না সাধারণ মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন হয়। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠন অসম্ভব। আজ যারা স্বেচ্ছায় অস্ত্র জমা দিয়েছেন, তারা সমাজে এক অনন্য ও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।”

 

​অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন, দবির উদ্দিন, সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), ​মুহম্মদ আল ফাহাদ, সহকারী পুলিশ সুপার (নগরকান্দা সার্কেল)।

​বক্তারা বলেন, সচেতনতা ও সামাজিক সম্মান প্রদানের মাধ্যমে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব, এই আয়োজন তারই বাস্তব প্রমাণ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই শান্তি বজায় রাখতে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়।

​স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রশাসনের এই ভিন্নধর্মী উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “মামলা-হামলা আর সংঘর্ষের কারণে আমাদের জীবন বিষিয়ে উঠেছিল। সন্তানরা শান্তিতে পড়াশোনা করতে পারত না। আজ অস্ত্র জমা দিয়ে বুক থেকে যেন একটা বড় পাথর নেমে গেল।”

​পেশাদার বিশ্লেষক ও স্থানীয় সুধীজনরা মনে করছেন, সালথার এই ‘অস্ত্রের বদলে ফুল’ মডেলটি দেশের অন্যান্য অপরাধপ্রবণ অঞ্চলের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে। জনসম্পৃক্ত এই মানবিক উদ্যোগ অপরাধের গ্রাফ নামিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদী ভূমিকা রাখবে।

​অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে উপস্থিত সর্বস্তরের মানুষ একে অপরের হাত ধরে এলাকায় চিরস্থায়ী শান্তি, সম্প্রীতি ও অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

About Author Information

জনপ্রিয় খবর

চতুর্থ দফায় স্বর্ণের মূল্যহ্রাস, ভরিপ্রতি দাম ২ লাখ ১৮ হাজার টাকা

সালথায় সংঘাতের অবসান: অস্ত্র জমা দিয়ে প্রশাসনের ফুল পেলেন গ্রামবাসী

আপডেট এর সময় : ৩ ঘন্টা আগে

ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় দীর্ঘদিনের গোষ্ঠীগত সংঘাত, কাঁচি-ঢাল আর টেঁটাযুদ্ধের সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে শান্তির পথে পা বাড়িয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অন্ধকার পথ ছেড়ে আলোর পথে ফিরে আসা এসব মানুষের শাস্তির ভয় দেখানোর পরিবর্তে বুকে টেনে নিয়েছে প্রশাসন। স্বেচ্ছায় দেশীয় অস্ত্র জমা দেওয়ায় তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে রজনীগন্ধার তোড়া।

​বুধবার (১০ জুন) বিকেলে সালথার মাঝারদিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে আয়োজিত এক ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানে গ্রামবাসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের ঘরে থাকা কয়েকশ দেশীয় অস্ত্র প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করেন। দীর্ঘদিনের জিঘাংসা ও কোন্দল ভুলে সমাজের শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার এই অনন্য উদ্যোগ জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

​সালথা এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার এবং তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের জন্য পরিচিত ছিল। তবে মাঝারদিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দারা এবার সেই কলঙ্কিত ইতিহাস মুঁছে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছেন।

​অনুষ্ঠানে দেখা যায়, গ্রামের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে যুবা-বৃদ্ধরা সারিবদ্ধভাবে এসে তাদের তৈরি করা ঢাল, সড়কি, টেঁটা, রামদাসহ বিভিন্ন মারাত্মক অস্ত্র প্রশাসনের কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। আর অস্ত্র জমা নেওয়া শেষে প্রশাসনের কর্মকর্তারা অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে তাদের ফুল দিয়ে বরণ করে নিচ্ছেন।

​বিগত দিনে যেখানে পুলিশের নাম শুনলেই আটকের ভয়ে গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে যেত, সেখানে সম্মান ও সামাজিক স্বীকৃতির মাধ্যমে মানুষকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলার এই মানবিক প্রয়াস উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে তোলে।

​সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাবলুর রহমান খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ফাতেমা ইসলাম।

​প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফাতেমা ইসলাম বলেন: ​”কেবলমাত্র কঠোর আইনি ব্যবস্থা দিয়ে অপরাধ দমন সম্ভব নয়, যদি না সাধারণ মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন হয়। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠন অসম্ভব। আজ যারা স্বেচ্ছায় অস্ত্র জমা দিয়েছেন, তারা সমাজে এক অনন্য ও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।”

 

​অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন, দবির উদ্দিন, সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), ​মুহম্মদ আল ফাহাদ, সহকারী পুলিশ সুপার (নগরকান্দা সার্কেল)।

​বক্তারা বলেন, সচেতনতা ও সামাজিক সম্মান প্রদানের মাধ্যমে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব, এই আয়োজন তারই বাস্তব প্রমাণ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই শান্তি বজায় রাখতে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়।

​স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রশাসনের এই ভিন্নধর্মী উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “মামলা-হামলা আর সংঘর্ষের কারণে আমাদের জীবন বিষিয়ে উঠেছিল। সন্তানরা শান্তিতে পড়াশোনা করতে পারত না। আজ অস্ত্র জমা দিয়ে বুক থেকে যেন একটা বড় পাথর নেমে গেল।”

​পেশাদার বিশ্লেষক ও স্থানীয় সুধীজনরা মনে করছেন, সালথার এই ‘অস্ত্রের বদলে ফুল’ মডেলটি দেশের অন্যান্য অপরাধপ্রবণ অঞ্চলের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে। জনসম্পৃক্ত এই মানবিক উদ্যোগ অপরাধের গ্রাফ নামিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদী ভূমিকা রাখবে।

​অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে উপস্থিত সর্বস্তরের মানুষ একে অপরের হাত ধরে এলাকায় চিরস্থায়ী শান্তি, সম্প্রীতি ও অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।