”মানুষ বাঁচে তার কর্মের মধ্যে, বয়সের মধ্যে নয়। মানুষ মরণশীল হলেও কর্মগুণে অমরত্ব লাভ করা সম্ভব। বেঁচে থাকার মানে কেবল জৈবিকভাবে বেঁচে থাকা নয়, বরং নিজের কাজের মধ্য দিয়ে মানুষের হৃদয়ে অমরত্ব লাভ করা। সংক্ষিপ্ত মানবজীবনকে অনন্তকাল বাঁচিয়ে রাখতে হলে তথা স্মরণীয়-বরণীয় করে রাখতে হলে কল্যাণকর কর্মের কোনো বিকল্প নেই।”
সদ্য প্রয়াত প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও দেশবরেণ্য আইনজ্ঞ ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে গভীর শ্রদ্ধা ও পরম মমতায় কথাগুলো বলছিলেন তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রবীণ নেতা এবং জয়পুরহাট-২ সংসদীয় আসনের ৪ বারের নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য ও হুইপ অ্যাডভোকেট আবু ইউসুফ মোঃ খলিলুর রহমান।
তিনি অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে ব্যক্ত করেন যে, কীর্তিমানের মৃত্যু নেই। তেমনি যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের নাম এদেশের মানুষের হৃদয়ে চির অমর হয়ে থাকবে।
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি একাধারে ছিলেন একজন বিশিষ্ট আইনজ্ঞ, সাবেক স্পিকার এবং সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। উত্তরবঙ্গের এক প্রত্যন্ত ও অবহেলিত অঞ্চল পঞ্চগড় থেকে উঠে এসে, সম্পূর্ণ নিজস্ব মেধা, সততা ও যোগ্যতার বলে তিনি লন্ডনের বিখ্যাত ‘লিংকনস ইন’ (Lincoln’s Inn) থেকে ব্যারিস্টারি ডিগ্রি অর্জন করেন।
পরবর্তীতে দেশে ফিরে তিনি জাতীয় রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় অসামান্য ও অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির অন্যতম এই শীর্ষ নেতা তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে দল ও রাষ্ট্রকে সংকটে ও সম্ভাবনায় সমানে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
আইন অঙ্গনে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি। সুপ্রিম কোর্ট কিংবা হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে দূর থেকে হ্যাট, কোট আর হাতে ছাতা পরিহিত কাউকে রাজকীয় ভঙ্গিতে হেঁটে আসতে দেখলেই যে কেউ অনায়াসে বুঝে নিতেন—তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। আইন পেশার প্রতি তাঁর ছিল অগাধ নিষ্ঠা। মক্কেলদের আইনি সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তিনি সবসময় অত্যন্ত তৎপর থাকতেন।
জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি যে নিরপেক্ষতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন, তা বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। দলমত নির্বিশেষে সংসদ ও সংসদের বাইরে তিনি সবার কাছে সমাদৃত, গ্রহণযোগ্য ও পরম শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবনে তাঁর সততা ও সজ্জন আচরণের জন্য কোনো মহলের পক্ষ থেকেই কখনো কোনো অভিযোগ বা কালিমার আঁচড় লাগেনি।
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে সাবেক হুইপ অ্যাডভোকেট আবু ইউসুফ মোঃ খলিলুর রহমান বলেন:”আমার পেশাগত ও রাজনৈতিক জীবনে এই মহান নেতার সঙ্গে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে। তিনি শুধু আমার প্রিয় সহকর্মীই ছিলেন না, ছিলেন আমার এক পরম আস্থাভাজন অভিভাবক। তাঁর প্রজ্ঞা, সৌম্য ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, কাজের প্রতি নিখাদ নিষ্ঠা এবং মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ও আন্তরিক ভালোবাসা আমাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করেছে।”
তিনি আরও বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের এই চলে যাওয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আইন অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর মতো অভিজ্ঞ, বিচক্ষণ, দূরদর্শী ও সজ্জন মানুষের শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
এই মহান কীর্তিমানের প্রয়াণে গভীর শোক ও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে প্রার্থনা, তিনি যেন এই দেশপ্রেমিক জননেতাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার, অসংখ্য রাজনৈতিক সহকর্মী ও গুণগ্রাহীদের এই গভীর শোক সহ্য করার শক্তি দান করেন।
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের বর্ণাঢ্য জীবন, আদর্শ এবং তাঁর নিখাদ দেশপ্রেমের স্মৃতি বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাস এবং আইন অঙ্গনের পাতায় চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কীর্তিমান এই পুরুষের প্রয়াণে আমরা জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

শফিউল মঞ্জুর ফরিদঃ 


















