Dhaka , শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ:
Logo ডিএসইর লেনদেন ছাড়াল ৯৩৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা Logo বহিষ্কৃত এমপির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ইসিতে জামায়াতের চিঠি Logo শুক্রবার ভারতজুড়ে বিক্ষোভের ডাক সিজেপিয়ের, উত্তেজনা তুঙ্গে Logo মুগদা থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে ২২ জন গ্রেফতার Logo সেবামূলক কার্যক্রমে মানুষের আস্থার প্রতীক ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ Logo ভারতের শিক্ষার্থী আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে সরব শোবিজ অঙ্গন Logo সিআইএমএস ফরম পূরণ সপ্তাহে রামপুরা থানায় র‍্যালি ও সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত Logo সৌদি আরবের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন চুক্তি Logo ইনভেস্টরস এক্সপো পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী Logo প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে প্রথমবার শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা, জবাব রাহুল গান্ধী ও সিপিআইয়ের

স্মৃতির পটে আমার দেখা বিভীষিকাময় ১৮ই জুলাই

ঢাকা, ১৯ জুলাই, ২০২৬ (দৈনিক আজাদ বানী) : ঐতিহাসিক জুলাই আন্দোলনের আমি একজন প্রত্যক্ষদর্শী গণমাধ্যমকর্মী শফিউল মঞ্জুর ফরিদ (প্রধান সম্পাদক,  দৈনিক আজাদ বানী ও অবাক পৃথিবী) স্মৃতির পথে থেকে যাওয়া কিছু কথা আজকের এই দিনে আমার লেখনীতে ব্যক্ত করলামঃ

​২০২৪ সালের ১৮ই জুলাই—বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ও রক্তঝরা দিন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ বা সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সেদিন রাজধানী ঢাকার অন্যতম প্রবেশদ্বার উত্তরা পরিণত হয়েছিল এক ভয়াবহ, নির্মম ও রক্তাক্ত রণক্ষেত্রে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাঁজোয়া যান, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেডের মুহুর্মুহু শব্দের বিপরীতে সাধারণ ছাত্র-জনতার অদম্য প্রতিরোধ সেদিন এক অভূতপূর্ব ইতিহাসের জন্ম দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে রূপ নেয়।

​আমার বাসস্থান উত্তরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ঠিক খুব নিকটে হওয়ায় সকাল থেকেই বাইরের পরিবেশটা কেমন যেন থমথমে আর অশান্ত মনে হচ্ছিল। বাতাসের মধ্যেও এক বুকচাপা উত্তেজনা ও ভয়ের আভাস মিলছিল। পেশাগত দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতার কারণে বেলা ১১টার দিকে আমি ক্যামেরা হাতে বাসা থেকে বের হই। গন্তব্য—উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার আব্দুল্লাহপুর মোড়। সেখানে পৌঁছে দেখতে পাই এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। পুরো মহাসড়ক ফাঁকা, কোনো সাধারণ যানবাহন নেই। রাস্তা দখল করে রীতিমতো পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যৌথ মহড়া ও টহল চলছিল। সাঁজোয়া যান আর বুটের শব্দে চারপাশ ভারী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এই দৃশ্য সাধারণ মানুষকে ভীত করার বদলে যেন এক প্রচ্ছন্ন প্রতিরোধ গড়ে তোলার বারুদ জোগাচ্ছিল। আশপাশের অলিগলি ও সড়কগুলোতে সাধারণ ছাত্র-জনতার উপস্থিতি ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছিল।

​সময় বাড়ার সাথে সাথে উত্তেজনার পারদ তীব্র হতে থাকে। হঠাৎ বেলা ১২টার দিকে উত্তরার বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো বাড়তে শুরু করে। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বিএনএস সেন্টারের সামনে আচমকায় যেন ছাত্র-জনতার এক বিশাল ঢল নামে। মুহূর্তের মধ্যে রাজপথের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাতে। পুলিশ ও সেনাবাহিনী বিভিন্ন রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করে এই উত্তাল জনস্রোত থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু দুপুরের জোহরের নামাজের ঠিক পর মুহূর্তে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা ও মসজিদ থেকে সাধারণ মানুষ ও যুবসমাজ এসে ছাত্রদের সাথে যোগ দিলে পুরো উত্তরা এলাকা এক উত্তাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

​বেলা ১১টা থেকেই আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা উত্তরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক এবং উত্তরার ভেতরের সড়কগুলোতে যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বিমানবন্দর মহাসড়ক সম্পূর্ণ অবরোধ করার ফলে রাজধানী ঢাকার সাথে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং দেশের উত্তরাঞ্চলের সড়ক ও রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পুরো এলাকা ঢাকা থেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়।

​বিকেলের দিকে পরিস্থিতি চূড়ান্ত রূপ নেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তৎকালীন সরকারদলীয় লোকজনের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় তুমুল সংঘর্ষ শুরু হয়। পুরো দেশের মধ্যে সেদিন উত্তরা এলাকায় সবচেয়ে তীব্র ও ভয়াবহ সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছিল। বেলা ৩টার দিকে উত্তরা আজমপুর মডেল থানার সামনে অসংখ্য পুলিশ ও সেনাবাহিনীর নিরেট ব্যারিকেড ভেঙে রুখে দাঁড়ায় ছাত্র-জনতার এক বিশাল স্রোত। সেই জনস্রোত সমস্ত বাধা উপড়ে ফেলে ঢাকা অভিমুখে রওনা হয়। উত্তরার বিভিন্ন পয়েন্টে তখন পুলিশের সাথে ছাত্রদের ব্যাপক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে, যাতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনতা আহত হন এবং বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান। আমার ক্যামেরা তখন চারপাশের এই ঐতিহাসিক ও ভয়াবহ চিত্র ধারণ করতে ব্যস্ত। বেলা ৪টার দিকে আমি সাহসের সাথে উত্তরা মডেল থানার ঠিক সামনে অবস্থান নিই। কিছু সময় পরেই চারদিক থেকে ধেয়ে আসা ক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে উত্তরা মডেল থানায় আগুন ধরিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে আকাশ কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায়। পুলিশও এর জবাবে মরিয়া হয়ে ওঠে। চারপাশ থেকে টিয়ারশেল, কাঁদানে গ্যাস এবং রাবার বুলেটের বৃষ্টি হতে থাকে। চারদিকের কানফাটানো শব্দ আর বারুদের গন্ধে নিঃশ্বাস নেওয়াই অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এই ভয়াবহ সংঘর্ষের মাঝেই আমি ও আমার সহযোগী রানা মারাত্মকভাবে আহত ও বুলেটবিদ্ধ হই। আমাদের শরীরে একের পর এক রাবার বুলেট ও স্প্লিন্টার এসে আঘাত হানে। রক্তাক্ত ও ক্ষতবিশেষ শরীর নিয়ে কোনোমতে আমরা উত্তরা কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালে পৌঁছাই। হাসপাতালে পা রাখতেই যে দৃশ্য দেখলাম, তা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে সহ্য করা কঠিন। পুরো হাসপাতাল যেন তখন এক জীবন্ত নরক। আহত মানুষের আর্তনাদ, নিহতদের স্বজনদের বুকফাটা আহাজারি আর রক্তের স্রোতে এক বিভীষিকাময় ও হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল। সেদিন এত বিপুলসংখ্যক আহত মানুষের চিকিৎসা দেওয়ার মতো ন্যূনতম প্রস্তুতি বা পরিস্থিতি হাসপাতালের ছিল না। চারিদিকে শুধু রক্ত আর ক্ষতবিশেষ মানুষ। ফলস্বরূপ, কোনো সুচিকিৎসা না পেয়ে নিজ নিজ উদ্যোগেই আমাদের ভর্তি হতে হয় এবং নিজেদের প্রাথমিক চিকিৎসা একপ্রকার নিজেদেরই করতে হয়েছিল। আমার শরীরের ছোট ছোট স্প্লিন্টারগুলো কোনোমতে বের করা সম্ভব হলেও, দুটি বড় রাবার বুলেট বাম হাতের মাংসের অনেক গভীরে চলে যাওয়ায় সেদিন তা বের করা সম্ভব হয়নি। অসহ্য শরীর ও হাতের তীব্র ব্যথা ও যন্ত্রণা নিয়ে হাসপাতালের বেডে ও বাসায় আরও তিনটি দিন অতিবাহিত হয়। অবশেষে তিন দিন পর কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালের চিকিৎসকদের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার করে বাম হাতের গভীর থেকে দুটি রাবার বুলেট বের করতে সক্ষম হই। আহত শরীর, হাতে ও পিঠে ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় কেটে যায় জুলাইয়ের বাকি দিনগুলো। তবে আমার শরীর অবশ হলেও রাজপথ অবশ হয়নি। ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে ৫ই আগস্ট পর্যন্ত এই খণ্ড খণ্ড সংঘর্ষ, রক্তপাত ও সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ চলতেই থাকে।

অবশেষে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব আত্মত্যাগ ও বীরত্বের মুখে ৫ই আগস্ট অর্জিত হয় এক ঐতিহাসিক বিজয়। পতন ঘটে দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসনের, পরিসমাপ্তি ঘটে জুলাই অভ্যুত্থানের। আর এর মাধ্যমেই শুরু হয় এক নতুন ও স্বাধীন বাংলাদেশের পথ চলা।

উত্তরায় ঝরে যাওয়া তাজা প্রাণ এবং ছাত্র-জনতার এই অভূতপূর্ব বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধকে স্মরণীয় করে রাখতে পরবর্তীতে বিভিন্ন সংগঠন ১৮ই জুলাইকে ‘জুলাই জাগরণ ও স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়। এই দিনটি আমাদের চিরকাল মনে করিয়ে দেবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ কীভাবে একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে নতুন ভোরের সূচনা করতে পারে।

About Author Information

জনপ্রিয় খবর

ডিএসইর লেনদেন ছাড়াল ৯৩৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা

স্মৃতির পটে আমার দেখা বিভীষিকাময় ১৮ই জুলাই

আপডেট এর সময় : ১০:১৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬

ঢাকা, ১৯ জুলাই, ২০২৬ (দৈনিক আজাদ বানী) : ঐতিহাসিক জুলাই আন্দোলনের আমি একজন প্রত্যক্ষদর্শী গণমাধ্যমকর্মী শফিউল মঞ্জুর ফরিদ (প্রধান সম্পাদক,  দৈনিক আজাদ বানী ও অবাক পৃথিবী) স্মৃতির পথে থেকে যাওয়া কিছু কথা আজকের এই দিনে আমার লেখনীতে ব্যক্ত করলামঃ

​২০২৪ সালের ১৮ই জুলাই—বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ও রক্তঝরা দিন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ বা সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সেদিন রাজধানী ঢাকার অন্যতম প্রবেশদ্বার উত্তরা পরিণত হয়েছিল এক ভয়াবহ, নির্মম ও রক্তাক্ত রণক্ষেত্রে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাঁজোয়া যান, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেডের মুহুর্মুহু শব্দের বিপরীতে সাধারণ ছাত্র-জনতার অদম্য প্রতিরোধ সেদিন এক অভূতপূর্ব ইতিহাসের জন্ম দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে রূপ নেয়।

​আমার বাসস্থান উত্তরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ঠিক খুব নিকটে হওয়ায় সকাল থেকেই বাইরের পরিবেশটা কেমন যেন থমথমে আর অশান্ত মনে হচ্ছিল। বাতাসের মধ্যেও এক বুকচাপা উত্তেজনা ও ভয়ের আভাস মিলছিল। পেশাগত দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতার কারণে বেলা ১১টার দিকে আমি ক্যামেরা হাতে বাসা থেকে বের হই। গন্তব্য—উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার আব্দুল্লাহপুর মোড়। সেখানে পৌঁছে দেখতে পাই এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। পুরো মহাসড়ক ফাঁকা, কোনো সাধারণ যানবাহন নেই। রাস্তা দখল করে রীতিমতো পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যৌথ মহড়া ও টহল চলছিল। সাঁজোয়া যান আর বুটের শব্দে চারপাশ ভারী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এই দৃশ্য সাধারণ মানুষকে ভীত করার বদলে যেন এক প্রচ্ছন্ন প্রতিরোধ গড়ে তোলার বারুদ জোগাচ্ছিল। আশপাশের অলিগলি ও সড়কগুলোতে সাধারণ ছাত্র-জনতার উপস্থিতি ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছিল।

​সময় বাড়ার সাথে সাথে উত্তেজনার পারদ তীব্র হতে থাকে। হঠাৎ বেলা ১২টার দিকে উত্তরার বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো বাড়তে শুরু করে। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বিএনএস সেন্টারের সামনে আচমকায় যেন ছাত্র-জনতার এক বিশাল ঢল নামে। মুহূর্তের মধ্যে রাজপথের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাতে। পুলিশ ও সেনাবাহিনী বিভিন্ন রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করে এই উত্তাল জনস্রোত থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু দুপুরের জোহরের নামাজের ঠিক পর মুহূর্তে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা ও মসজিদ থেকে সাধারণ মানুষ ও যুবসমাজ এসে ছাত্রদের সাথে যোগ দিলে পুরো উত্তরা এলাকা এক উত্তাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

​বেলা ১১টা থেকেই আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা উত্তরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক এবং উত্তরার ভেতরের সড়কগুলোতে যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বিমানবন্দর মহাসড়ক সম্পূর্ণ অবরোধ করার ফলে রাজধানী ঢাকার সাথে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং দেশের উত্তরাঞ্চলের সড়ক ও রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পুরো এলাকা ঢাকা থেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়।

​বিকেলের দিকে পরিস্থিতি চূড়ান্ত রূপ নেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তৎকালীন সরকারদলীয় লোকজনের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় তুমুল সংঘর্ষ শুরু হয়। পুরো দেশের মধ্যে সেদিন উত্তরা এলাকায় সবচেয়ে তীব্র ও ভয়াবহ সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছিল। বেলা ৩টার দিকে উত্তরা আজমপুর মডেল থানার সামনে অসংখ্য পুলিশ ও সেনাবাহিনীর নিরেট ব্যারিকেড ভেঙে রুখে দাঁড়ায় ছাত্র-জনতার এক বিশাল স্রোত। সেই জনস্রোত সমস্ত বাধা উপড়ে ফেলে ঢাকা অভিমুখে রওনা হয়। উত্তরার বিভিন্ন পয়েন্টে তখন পুলিশের সাথে ছাত্রদের ব্যাপক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে, যাতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনতা আহত হন এবং বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান। আমার ক্যামেরা তখন চারপাশের এই ঐতিহাসিক ও ভয়াবহ চিত্র ধারণ করতে ব্যস্ত। বেলা ৪টার দিকে আমি সাহসের সাথে উত্তরা মডেল থানার ঠিক সামনে অবস্থান নিই। কিছু সময় পরেই চারদিক থেকে ধেয়ে আসা ক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে উত্তরা মডেল থানায় আগুন ধরিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে আকাশ কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায়। পুলিশও এর জবাবে মরিয়া হয়ে ওঠে। চারপাশ থেকে টিয়ারশেল, কাঁদানে গ্যাস এবং রাবার বুলেটের বৃষ্টি হতে থাকে। চারদিকের কানফাটানো শব্দ আর বারুদের গন্ধে নিঃশ্বাস নেওয়াই অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এই ভয়াবহ সংঘর্ষের মাঝেই আমি ও আমার সহযোগী রানা মারাত্মকভাবে আহত ও বুলেটবিদ্ধ হই। আমাদের শরীরে একের পর এক রাবার বুলেট ও স্প্লিন্টার এসে আঘাত হানে। রক্তাক্ত ও ক্ষতবিশেষ শরীর নিয়ে কোনোমতে আমরা উত্তরা কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালে পৌঁছাই। হাসপাতালে পা রাখতেই যে দৃশ্য দেখলাম, তা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে সহ্য করা কঠিন। পুরো হাসপাতাল যেন তখন এক জীবন্ত নরক। আহত মানুষের আর্তনাদ, নিহতদের স্বজনদের বুকফাটা আহাজারি আর রক্তের স্রোতে এক বিভীষিকাময় ও হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল। সেদিন এত বিপুলসংখ্যক আহত মানুষের চিকিৎসা দেওয়ার মতো ন্যূনতম প্রস্তুতি বা পরিস্থিতি হাসপাতালের ছিল না। চারিদিকে শুধু রক্ত আর ক্ষতবিশেষ মানুষ। ফলস্বরূপ, কোনো সুচিকিৎসা না পেয়ে নিজ নিজ উদ্যোগেই আমাদের ভর্তি হতে হয় এবং নিজেদের প্রাথমিক চিকিৎসা একপ্রকার নিজেদেরই করতে হয়েছিল। আমার শরীরের ছোট ছোট স্প্লিন্টারগুলো কোনোমতে বের করা সম্ভব হলেও, দুটি বড় রাবার বুলেট বাম হাতের মাংসের অনেক গভীরে চলে যাওয়ায় সেদিন তা বের করা সম্ভব হয়নি। অসহ্য শরীর ও হাতের তীব্র ব্যথা ও যন্ত্রণা নিয়ে হাসপাতালের বেডে ও বাসায় আরও তিনটি দিন অতিবাহিত হয়। অবশেষে তিন দিন পর কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালের চিকিৎসকদের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার করে বাম হাতের গভীর থেকে দুটি রাবার বুলেট বের করতে সক্ষম হই। আহত শরীর, হাতে ও পিঠে ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় কেটে যায় জুলাইয়ের বাকি দিনগুলো। তবে আমার শরীর অবশ হলেও রাজপথ অবশ হয়নি। ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে ৫ই আগস্ট পর্যন্ত এই খণ্ড খণ্ড সংঘর্ষ, রক্তপাত ও সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ চলতেই থাকে।

অবশেষে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব আত্মত্যাগ ও বীরত্বের মুখে ৫ই আগস্ট অর্জিত হয় এক ঐতিহাসিক বিজয়। পতন ঘটে দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসনের, পরিসমাপ্তি ঘটে জুলাই অভ্যুত্থানের। আর এর মাধ্যমেই শুরু হয় এক নতুন ও স্বাধীন বাংলাদেশের পথ চলা।

উত্তরায় ঝরে যাওয়া তাজা প্রাণ এবং ছাত্র-জনতার এই অভূতপূর্ব বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধকে স্মরণীয় করে রাখতে পরবর্তীতে বিভিন্ন সংগঠন ১৮ই জুলাইকে ‘জুলাই জাগরণ ও স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়। এই দিনটি আমাদের চিরকাল মনে করিয়ে দেবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ কীভাবে একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে নতুন ভোরের সূচনা করতে পারে।