Dhaka , সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ:
Logo জয়পুরহাটে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত ২১ পরিবার পেলেন ৭৭ লাখ টাকা Logo বিশেষ অভিযানে ২৯ জনকে গ্রেফতার, তৎপর যাত্রাবাড়ী-মুগদা পুলিশ Logo রক্তদান সুস্থ-সক্ষম মানুষের নৈতিক দায়িত্ব ও জীবন বাঁচানোর অঙ্গীকার Logo আশুরার তারিখ চূড়ান্তে কাল বৈঠকে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি Logo সবুজবাগে ইয়াবা-গাঁজা, নগদ টাকা ও অস্ত্রসহ গ্রেফতার ১ Logo তারল্য সংকটে ইসলামী ব্যাংক, ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সহায়তা বাংলাদেশ ব্যাংকের Logo কুরাসাওকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দিল জার্মানি, ড্রয়ে বিশ্বকাপ শুরু জাপানের Logo মুন্সীগঞ্জে বোরো ধানের বাম্পার ফলন, কৃষকদের মুখে হাসি Logo যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তি, স্থায়ীভাবে বন্ধ হচ্ছে সামরিক অভিযান Logo ৫জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে গুরুত্ব, প্রযুক্তি খাতে বছরে ২ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য

রক্তদান সুস্থ-সক্ষম মানুষের নৈতিক দায়িত্ব ও জীবন বাঁচানোর অঙ্গীকার

রক্তদান মহৎ এক সৎকর্ম। আপনি যে সুস্থ আছেন এর শুকরিয়ার বহিঃপ্রকাশ স্বরূপ রক্তদান করুন। অনেকে আছেন ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও রক্তদান করার সুযোগ পান না। কারণ শারীরিক নানা জটিলতা তাকে রক্তদান করতে অনুমোদন দেয় না। একবার ভাবুন, আপনি রক্ত দিতে পারছেন, এটি আপনার জন্যে কত বড় সৌভাগ্যের। আপনাকে রক্তগ্রহীতা হতে হয় নি। অধিকাংশ থ্যালাসেমিয়া রোগীদের প্রতিমাসে রক্ত সংগ্রহ করতে হয়। এসব রোগীর রক্ত সংগ্রহ করতে দেরি হলে খাবারে অরুচি, মাথা ঘোরা, ঝিমঝিম ভাবসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়। একটু চিন্তা করুন তাদের কথা। সে হিসেবে আমরা কত ভালো আছি!

রক্তদানের শারীরিক উপকারিতা বহুবিধ। যারা নিয়মিত রক্ত দান করেন, তাদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে ৮৮ ভাগ কম এবং স্ট্রোকসহ অন্যান্য মারাত্মক রোগের ঝুঁকি ৩৩ ভাগ কম। নিয়মিত রক্ত দিলে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে। বিশেষ করে ফুসফুস, লিভার, কোলন, পাকস্থলী ও গলার ক্যান্সারের ঝুঁকি। রক্তদানের সাথে সাথে শরীরের বোন ম্যারো নতুন কণিকা তৈরির জন্যে উদ্দীপ্ত হয়। রক্তদান করার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই দেহে রক্তের পরিমাণ স্বাভাবিক হয়ে যায়। আর লোহিত কণিকার ঘাটতি পূরণ হতে সময় লাগে চার থেকে আট সপ্তাহ। এই পুরো প্রক্রিয়া দেহের সার্বিক সুস্থতা, প্রাণবন্ততা আর কর্মক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয়।

রক্ত দানে মেলে প্রকৃতির প্রতিদান। যখনই আপনি অন্যের জন্যে ভালো কিছু করলেন, প্রকৃতিতে আপনার জন্যে ভালো কিছু জমা থাকে। অনেক রক্তদাতা রয়েছেন, যারা নিয়মিত রক্তদান করেন। দানের কল্যাণে রক্তদাতার জীবনে বালা-মুসিবতের পরিমাণ কমে আসে। এমনও দেখা গেছে, একজন রক্তদাতা যে বাসে চড়েছেন সেই বাস এক্সিডেন্ট হয়েছে, সেখানে অন্য সবাই আহত হয়েছেন, রক্তাক্ত হয়েছেন কিন্তু রক্তদাতার তেমন কিছুই হয় নি। আবার একজন রক্তদাতা দুর্ঘটনায় পড়লে অচেনা অজানা জায়গায়ও তার রক্ত জোগাড় হয়ে যায় সহজেই। আসলে অন্যের কল্যাণে দান করেন বলেই হয়তো প্রকৃতির প্রতিদান স্বরূপ রক্তদাতার প্রয়োজনে অন্যরা এগিয়ে আসেন।

ধর্মীয় দিক থেকেও রক্তদান অত্যন্ত পুণ্যের ও পরিতৃপ্তির। পবিত্র কোরআনের সূরা মায়েদার ৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘যখন কেউ নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল। আর যখন কেউ কোনো মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।’

বাইবেলে বলা হয়েছে, সৎকাজ সম্পর্কে জানার পরও তা থেকে বিরত থাকা পাপ। (যাকোব ৪:১৭)

ঋগবেদে বলা হয়েছে, নিঃশর্ত দানের জন্যে রয়েছে চমৎকার পুরস্কার। তারা লাভ করে আশীর্বাদধন্য দীর্ঘজীবন ও অমরত্ব। সব ধর্মেই দানকে উৎসাহিত করা হয়েছে। আমরা বলতে পারি যত ধরনের দান আছে তার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দান।

কেউ যদি শারীরিকভাবে সুস্থ থাকেন এবং তার বয়স যদি ১৮-৬০ বছরের মধ্যে হয়, ওজন যদি ঠিক থাকে এবং তিনি যদি সুস্থ থাকেন, যদি কোনো সংক্রামক বা অসংক্রামক ব্যাধি না থাকে, যদি আয়রনের ঘাটতি না থাকে তাহলেই তিনি প্রতি চার মাস পর পর রক্ত দিতে পারেন।

আমাদের দেশে রক্তদানে উদ্বুদ্ধকরণ ও রোগীদের সেবা দিতে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে বহু সংগঠন। এর মধ্যে রাজধানীর শান্তিনগরের কোয়ান্টাম ল্যাবের কথা উল্লেখ করা যায়। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা সেবা দানকারী এ ল্যাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম মেনে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর সেই পরিমাণ রক্তই নেয়া হয় যা রক্তদাতার দেহ থেকে এমনিই বর্জ্য হিসেবে বেরিয়ে যায়। তাই রক্তদানের ফলে দাতার শারীরিক কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই। বরং এমন ল্যাবে রক্ত উপাদান পৃথক করার মাধ্যমে একব্যাগ রক্ত থেকে চার জন মুমূর্ষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হতে পারে।

অনেক সময় মনে হতে পারে যে, আমি একা রক্ত দিলে কী হবে? আপনি যখন একা করবেন আপনাকে করতে দেখে আরেকজন অনুপ্রাণিত হবেন, তাকে দেখে আরেকজন। এভাবে সবাই মিলে রক্তের যে চাহিদা সেটি পূরণ করা সম্ভব। ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে যারা রক্ত দিয়েছি ভাষার জন্যে, যারা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, সেই দেশের মানুষ রক্তের অভাবে মারা যাবে এটি হতে পারে না। এজন্যে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে তরুণদেরকেই। ১৪ জুন পালিত হচ্ছে বিশ্ব রক্তদাতা দিবস। দিবস উদযাপনের এই প্রাক্কালে যাদেরই শারীরিক সক্ষমতা আছে এবং রক্তদানের সময় হয়েছে তারা ল্যাবে গিয়ে রক্ত দান করুন। আজই ছোট্ট একটি সিদ্ধান্ত নিন, ‘আমি রক্ত দেবো’। মনে রাখবেন, রক্ত কেনা যায় না, রক্তের বিকল্প শুধু রক্তই। বিগত কয়েক বছরে দেশে স্বেচ্ছা রক্তাদাতার সংখ্যা বেশ বেড়েছে। তবে এক্ষেত্রে নারীরা পিছিয়ে আছেন অনেকটাই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, বাংলাদেশে রক্তদাতাদের মধ্যে মাত্র ৬ শতাংশ নারী!

 

কিন্তু নারীরা কেন পিছিয়ে?

রক্তদানের ক্ষেত্রে নারীদের পিছিয়ে থাকার কারণ অনেকাংশেই পরিবার বা নিকটাত্মীয়।

‘মেয়ে মানুষ, সুঁইয়ের খোঁচা সহ্য করতে পারবে তো?’

‘মেয়েদের শরীরে তো এমনিতেই রক্ত কম!’

‘রক্ত দিলে চেহারা খারাপ হয়ে যাবে’

‘এমনিতেই তো হ্যাংলা পাতলা; রক্ত দিলে তো শরীরে কিছুই থাকবে না!’

এমন অজস্র ভুল ধারণা বা ভ্রান্তবিশ্বাস নারীদের মনে ঢ়ুকে যায় কাছের মানুষদের মুখে বারংবার এই নেতিকথাগুলো শুনতে শুনতে। অথচ সন্তান ধারণ থেকে শুরু করে জন্মদানের মতো দীর্ঘ অবর্ণনীয় কষ্টকর প্রক্রিয়া সহ্য করার স্রষ্টাপ্রদত্ত শক্তি রয়েছে নারীদের। অতএব, একটুখানি প্রেরণা আর উৎসাহ পেলে রক্তদানের মতো এতবড় একটি পূণ্যের কাজেও নারীরা এগিয়ে যাবেন রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের আর দশনা অঙ্গনের মতো।

 

একজন নারী কখন রক্ত দিতে পারবেন?

রক্তদানের ক্ষেত্রে নারীদের বিশেষ কোনো যোগ্যতার প্রয়োজন নেই। পুরুষ হোক বা নারী, শারীরিকভাবে সুস্থ হলে যে-কেউই চার মাস পর পর রক্ত দিতে পারবেন। ওজন ন্যূনতম ৫০ কেজি, বয়স ১৮ থেকে ৬০-এর মধ্যে, রক্তচাপ স্বাভাবিক এবং রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ প্রতি ডেসিলিটারে ১৪ গ্রাম- নারীদের রক্তদানের যোগ্যতা স্রেফ এগুলোই।

এক ব্যাগ দেয়ার পরেও শরীরে থাকে বাড়তি রক্ত!

অনেকেরই ধারণা, রক্ত দিলে বুঝি শরীরে রক্তের কমতি পড়ে! ধারণাটি ভুল। গড়পরতা পুরুষদের শরীরে উদ্বৃত্ত রক্তের পরিমাণ ১৩০০ মি.লি. এবং নারীদের ৮০০ মি.লি.। অন্যদিকে, স্বেচ্ছা রক্তদানে একজন দাতার কাছ থেকে নেয়া হয় মাত্র ৩৫০ থেকে ৪০০ মিলিলিটার রক্ত। তাই এক ব্যাগ রক্ত দেয়ার পরও শরীরে থাকে পর্যাপ্ত রক্ত। আর রক্তদানের পরবর্তী কিছুদিন ভিটামিন-সি যুক্ত ফলমূল, সবুজ শাকসবজি, ডিম, মাছ, মাংস, দুধ খেলে এবং পর্যাপ্ত পানি পান করলে প্রদত্ত রক্তের ঘাটতি পূরণ হয়ে যায়।

 

কখন রক্ত দেয়া যাবে না?

কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে নারীদের রক্তদান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। মাসিক চলাকালীন সময়ে রক্ত দেয়া যাবে না। মাসিক শেষ হবার সাত দিন পর নারীরা রক্ত দিতে পারেন। অন্তঃসত্ত্বা কিংবা প্রসূতি, স্তন্যদানকারী মা কিংবা গর্ভপাত হয়ে থাকলে রক্তে আয়রনের মাত্রা স্বাভাবিকের চাইতে কিছুটা কম থাকে। তাই আয়রনের মাত্রা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত রক্তদান থেকে বিরত থাকতে হবে। এ-ছাড়াও কোনো অসুস্থতার কারণে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করলে ওষুধের কোর্স চলাকালীন সময়ে রক্তদান করা যাবে না। কোর্স শেষ হওয়ার সাত দিন পর থেকে রক্ত দেয়া যাবে।

 

‘রক্ত দিলে আমার কী লাভ?’

সব কথার পরও প্রাসঙ্গিক কথা হলো- একজন নারী কেন রক্ত দেবেন? দিয়ে তার কী লাভ? আসলে রক্তদান দাতার জন্যেই কল্যাণের। নিয়মিত রক্তদাতাদের ফুসফুস, লিভার, পাকস্থলী, কোলন ক্যান্সারসহ ১৭টিরও বেশি রোগের ঝুঁকি কম থাকে। ওজন নিয়ন্ত্রণের দিকে ঝোঁক থাকে অনেক নারীরই। তাদের জন্যে সুখবর হলো, নিয়মিত রক্তদান ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে; কমিয়ে দেয় শরীরে অতিরিক্ত মেদ জমার প্রবণতা। শরীরে ফ্রি রেডিকেল তৈরি হওয়ার কারণে বয়স বাড়ার সাথে সাথে বুড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়, নারীদের ক্ষেত্রে যা বেশি দৃশ্যমান। রক্ত দিলে শরীর থেকে ফ্রি রেডিকেলগুলো বের হয়ে যায়, যা সাহায্য করে তারুণ্য ধরে রাখতে। এ-ছাড়াও, নিয়মিত রক্তদানে ত্বক থাকে টানটান ও লাবণ্যময়, দেহমন থাকে প্রাণবন্ত ও এনার্জেটিক। তাই নারী হিসেবে যেখানে অন্যান্য ক্ষেত্রে আপনি এগিয়ে আছেন, রক্তদানের মতো মহৎকাজে কেন পিছিয়ে থাকবেন?

 

আসুন, সাহসী  সিদ্ধান্ত নিন; ১৯তম জন্মদিনকে স্মরণীয় ও রহমতে পূর্ণ করুন রক্তদানের মাধ্যমে। প্রকৃতির প্রতিদানেই বরকত ও প্রাপ্তিতে ভরে উঠবে আপনার জীবন।

About Author Information

জনপ্রিয় খবর

জয়পুরহাটে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত ২১ পরিবার পেলেন ৭৭ লাখ টাকা

রক্তদান সুস্থ-সক্ষম মানুষের নৈতিক দায়িত্ব ও জীবন বাঁচানোর অঙ্গীকার

আপডেট এর সময় : ৪ ঘন্টা আগে

রক্তদান মহৎ এক সৎকর্ম। আপনি যে সুস্থ আছেন এর শুকরিয়ার বহিঃপ্রকাশ স্বরূপ রক্তদান করুন। অনেকে আছেন ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও রক্তদান করার সুযোগ পান না। কারণ শারীরিক নানা জটিলতা তাকে রক্তদান করতে অনুমোদন দেয় না। একবার ভাবুন, আপনি রক্ত দিতে পারছেন, এটি আপনার জন্যে কত বড় সৌভাগ্যের। আপনাকে রক্তগ্রহীতা হতে হয় নি। অধিকাংশ থ্যালাসেমিয়া রোগীদের প্রতিমাসে রক্ত সংগ্রহ করতে হয়। এসব রোগীর রক্ত সংগ্রহ করতে দেরি হলে খাবারে অরুচি, মাথা ঘোরা, ঝিমঝিম ভাবসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়। একটু চিন্তা করুন তাদের কথা। সে হিসেবে আমরা কত ভালো আছি!

রক্তদানের শারীরিক উপকারিতা বহুবিধ। যারা নিয়মিত রক্ত দান করেন, তাদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে ৮৮ ভাগ কম এবং স্ট্রোকসহ অন্যান্য মারাত্মক রোগের ঝুঁকি ৩৩ ভাগ কম। নিয়মিত রক্ত দিলে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে। বিশেষ করে ফুসফুস, লিভার, কোলন, পাকস্থলী ও গলার ক্যান্সারের ঝুঁকি। রক্তদানের সাথে সাথে শরীরের বোন ম্যারো নতুন কণিকা তৈরির জন্যে উদ্দীপ্ত হয়। রক্তদান করার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই দেহে রক্তের পরিমাণ স্বাভাবিক হয়ে যায়। আর লোহিত কণিকার ঘাটতি পূরণ হতে সময় লাগে চার থেকে আট সপ্তাহ। এই পুরো প্রক্রিয়া দেহের সার্বিক সুস্থতা, প্রাণবন্ততা আর কর্মক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয়।

রক্ত দানে মেলে প্রকৃতির প্রতিদান। যখনই আপনি অন্যের জন্যে ভালো কিছু করলেন, প্রকৃতিতে আপনার জন্যে ভালো কিছু জমা থাকে। অনেক রক্তদাতা রয়েছেন, যারা নিয়মিত রক্তদান করেন। দানের কল্যাণে রক্তদাতার জীবনে বালা-মুসিবতের পরিমাণ কমে আসে। এমনও দেখা গেছে, একজন রক্তদাতা যে বাসে চড়েছেন সেই বাস এক্সিডেন্ট হয়েছে, সেখানে অন্য সবাই আহত হয়েছেন, রক্তাক্ত হয়েছেন কিন্তু রক্তদাতার তেমন কিছুই হয় নি। আবার একজন রক্তদাতা দুর্ঘটনায় পড়লে অচেনা অজানা জায়গায়ও তার রক্ত জোগাড় হয়ে যায় সহজেই। আসলে অন্যের কল্যাণে দান করেন বলেই হয়তো প্রকৃতির প্রতিদান স্বরূপ রক্তদাতার প্রয়োজনে অন্যরা এগিয়ে আসেন।

ধর্মীয় দিক থেকেও রক্তদান অত্যন্ত পুণ্যের ও পরিতৃপ্তির। পবিত্র কোরআনের সূরা মায়েদার ৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘যখন কেউ নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল। আর যখন কেউ কোনো মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।’

বাইবেলে বলা হয়েছে, সৎকাজ সম্পর্কে জানার পরও তা থেকে বিরত থাকা পাপ। (যাকোব ৪:১৭)

ঋগবেদে বলা হয়েছে, নিঃশর্ত দানের জন্যে রয়েছে চমৎকার পুরস্কার। তারা লাভ করে আশীর্বাদধন্য দীর্ঘজীবন ও অমরত্ব। সব ধর্মেই দানকে উৎসাহিত করা হয়েছে। আমরা বলতে পারি যত ধরনের দান আছে তার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দান।

কেউ যদি শারীরিকভাবে সুস্থ থাকেন এবং তার বয়স যদি ১৮-৬০ বছরের মধ্যে হয়, ওজন যদি ঠিক থাকে এবং তিনি যদি সুস্থ থাকেন, যদি কোনো সংক্রামক বা অসংক্রামক ব্যাধি না থাকে, যদি আয়রনের ঘাটতি না থাকে তাহলেই তিনি প্রতি চার মাস পর পর রক্ত দিতে পারেন।

আমাদের দেশে রক্তদানে উদ্বুদ্ধকরণ ও রোগীদের সেবা দিতে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে বহু সংগঠন। এর মধ্যে রাজধানীর শান্তিনগরের কোয়ান্টাম ল্যাবের কথা উল্লেখ করা যায়। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা সেবা দানকারী এ ল্যাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম মেনে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর সেই পরিমাণ রক্তই নেয়া হয় যা রক্তদাতার দেহ থেকে এমনিই বর্জ্য হিসেবে বেরিয়ে যায়। তাই রক্তদানের ফলে দাতার শারীরিক কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই। বরং এমন ল্যাবে রক্ত উপাদান পৃথক করার মাধ্যমে একব্যাগ রক্ত থেকে চার জন মুমূর্ষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হতে পারে।

অনেক সময় মনে হতে পারে যে, আমি একা রক্ত দিলে কী হবে? আপনি যখন একা করবেন আপনাকে করতে দেখে আরেকজন অনুপ্রাণিত হবেন, তাকে দেখে আরেকজন। এভাবে সবাই মিলে রক্তের যে চাহিদা সেটি পূরণ করা সম্ভব। ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে যারা রক্ত দিয়েছি ভাষার জন্যে, যারা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, সেই দেশের মানুষ রক্তের অভাবে মারা যাবে এটি হতে পারে না। এজন্যে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে তরুণদেরকেই। ১৪ জুন পালিত হচ্ছে বিশ্ব রক্তদাতা দিবস। দিবস উদযাপনের এই প্রাক্কালে যাদেরই শারীরিক সক্ষমতা আছে এবং রক্তদানের সময় হয়েছে তারা ল্যাবে গিয়ে রক্ত দান করুন। আজই ছোট্ট একটি সিদ্ধান্ত নিন, ‘আমি রক্ত দেবো’। মনে রাখবেন, রক্ত কেনা যায় না, রক্তের বিকল্প শুধু রক্তই। বিগত কয়েক বছরে দেশে স্বেচ্ছা রক্তাদাতার সংখ্যা বেশ বেড়েছে। তবে এক্ষেত্রে নারীরা পিছিয়ে আছেন অনেকটাই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, বাংলাদেশে রক্তদাতাদের মধ্যে মাত্র ৬ শতাংশ নারী!

 

কিন্তু নারীরা কেন পিছিয়ে?

রক্তদানের ক্ষেত্রে নারীদের পিছিয়ে থাকার কারণ অনেকাংশেই পরিবার বা নিকটাত্মীয়।

‘মেয়ে মানুষ, সুঁইয়ের খোঁচা সহ্য করতে পারবে তো?’

‘মেয়েদের শরীরে তো এমনিতেই রক্ত কম!’

‘রক্ত দিলে চেহারা খারাপ হয়ে যাবে’

‘এমনিতেই তো হ্যাংলা পাতলা; রক্ত দিলে তো শরীরে কিছুই থাকবে না!’

এমন অজস্র ভুল ধারণা বা ভ্রান্তবিশ্বাস নারীদের মনে ঢ়ুকে যায় কাছের মানুষদের মুখে বারংবার এই নেতিকথাগুলো শুনতে শুনতে। অথচ সন্তান ধারণ থেকে শুরু করে জন্মদানের মতো দীর্ঘ অবর্ণনীয় কষ্টকর প্রক্রিয়া সহ্য করার স্রষ্টাপ্রদত্ত শক্তি রয়েছে নারীদের। অতএব, একটুখানি প্রেরণা আর উৎসাহ পেলে রক্তদানের মতো এতবড় একটি পূণ্যের কাজেও নারীরা এগিয়ে যাবেন রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের আর দশনা অঙ্গনের মতো।

 

একজন নারী কখন রক্ত দিতে পারবেন?

রক্তদানের ক্ষেত্রে নারীদের বিশেষ কোনো যোগ্যতার প্রয়োজন নেই। পুরুষ হোক বা নারী, শারীরিকভাবে সুস্থ হলে যে-কেউই চার মাস পর পর রক্ত দিতে পারবেন। ওজন ন্যূনতম ৫০ কেজি, বয়স ১৮ থেকে ৬০-এর মধ্যে, রক্তচাপ স্বাভাবিক এবং রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ প্রতি ডেসিলিটারে ১৪ গ্রাম- নারীদের রক্তদানের যোগ্যতা স্রেফ এগুলোই।

এক ব্যাগ দেয়ার পরেও শরীরে থাকে বাড়তি রক্ত!

অনেকেরই ধারণা, রক্ত দিলে বুঝি শরীরে রক্তের কমতি পড়ে! ধারণাটি ভুল। গড়পরতা পুরুষদের শরীরে উদ্বৃত্ত রক্তের পরিমাণ ১৩০০ মি.লি. এবং নারীদের ৮০০ মি.লি.। অন্যদিকে, স্বেচ্ছা রক্তদানে একজন দাতার কাছ থেকে নেয়া হয় মাত্র ৩৫০ থেকে ৪০০ মিলিলিটার রক্ত। তাই এক ব্যাগ রক্ত দেয়ার পরও শরীরে থাকে পর্যাপ্ত রক্ত। আর রক্তদানের পরবর্তী কিছুদিন ভিটামিন-সি যুক্ত ফলমূল, সবুজ শাকসবজি, ডিম, মাছ, মাংস, দুধ খেলে এবং পর্যাপ্ত পানি পান করলে প্রদত্ত রক্তের ঘাটতি পূরণ হয়ে যায়।

 

কখন রক্ত দেয়া যাবে না?

কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে নারীদের রক্তদান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। মাসিক চলাকালীন সময়ে রক্ত দেয়া যাবে না। মাসিক শেষ হবার সাত দিন পর নারীরা রক্ত দিতে পারেন। অন্তঃসত্ত্বা কিংবা প্রসূতি, স্তন্যদানকারী মা কিংবা গর্ভপাত হয়ে থাকলে রক্তে আয়রনের মাত্রা স্বাভাবিকের চাইতে কিছুটা কম থাকে। তাই আয়রনের মাত্রা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত রক্তদান থেকে বিরত থাকতে হবে। এ-ছাড়াও কোনো অসুস্থতার কারণে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করলে ওষুধের কোর্স চলাকালীন সময়ে রক্তদান করা যাবে না। কোর্স শেষ হওয়ার সাত দিন পর থেকে রক্ত দেয়া যাবে।

 

‘রক্ত দিলে আমার কী লাভ?’

সব কথার পরও প্রাসঙ্গিক কথা হলো- একজন নারী কেন রক্ত দেবেন? দিয়ে তার কী লাভ? আসলে রক্তদান দাতার জন্যেই কল্যাণের। নিয়মিত রক্তদাতাদের ফুসফুস, লিভার, পাকস্থলী, কোলন ক্যান্সারসহ ১৭টিরও বেশি রোগের ঝুঁকি কম থাকে। ওজন নিয়ন্ত্রণের দিকে ঝোঁক থাকে অনেক নারীরই। তাদের জন্যে সুখবর হলো, নিয়মিত রক্তদান ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে; কমিয়ে দেয় শরীরে অতিরিক্ত মেদ জমার প্রবণতা। শরীরে ফ্রি রেডিকেল তৈরি হওয়ার কারণে বয়স বাড়ার সাথে সাথে বুড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়, নারীদের ক্ষেত্রে যা বেশি দৃশ্যমান। রক্ত দিলে শরীর থেকে ফ্রি রেডিকেলগুলো বের হয়ে যায়, যা সাহায্য করে তারুণ্য ধরে রাখতে। এ-ছাড়াও, নিয়মিত রক্তদানে ত্বক থাকে টানটান ও লাবণ্যময়, দেহমন থাকে প্রাণবন্ত ও এনার্জেটিক। তাই নারী হিসেবে যেখানে অন্যান্য ক্ষেত্রে আপনি এগিয়ে আছেন, রক্তদানের মতো মহৎকাজে কেন পিছিয়ে থাকবেন?

 

আসুন, সাহসী  সিদ্ধান্ত নিন; ১৯তম জন্মদিনকে স্মরণীয় ও রহমতে পূর্ণ করুন রক্তদানের মাধ্যমে। প্রকৃতির প্রতিদানেই বরকত ও প্রাপ্তিতে ভরে উঠবে আপনার জীবন।