সরকারি দলিলের পবিত্রতা নষ্ট করে বালাম বইয়ে ‘ফ্লুইড-ঘষামাজার’ মাধ্যমে জমি গায়েব করার চাঞ্চল্যকর মামলায় ফেঁসে গেলেন সাবেক সদর সাব-রেজিস্ট্রার মো. ইউসুফ আলী মিয়া। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় আজ রবিবার (৫ জুলাই) দুপুরে ফরিদপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক সেলিম রেজা তাঁর জামিন আবেদন নাকচ করে সরাসরি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আদালতের এই আদেশের পর সাবেক এই সরকারি কর্মকর্তাকে কঠোর নিরাপত্তায় শ্রীঘরে পাঠানো হয়েছে। খোদ সাব-রেজিস্ট্রারের এই পতনকে ফরিদপুরের ভূমি সংক্রান্ত দুর্নীতির ইতিহাসে একটি বড় ধাক্কা এবং দুর্নীতিবাজদের জন্য কড়া বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ঘটনার সূত্রপাত ২০১৭ সালের মে মাসে, একটি মূল্যবান ‘হেবা ঘোষণাপত্র’ দলিলকে (নং-৪০৬৭) কেন্দ্র করে। তৎকালীন সাব-রেজিস্ট্রারসহ মোট পাঁচজন সরকারি কর্মচারী ও সুবিধাভোগী মিলে বালাম বইয়ের পাতায় এক অভিনব জালিয়াতির ছক কষেন।
দলিলের মূল কপির ষষ্ঠ পৃষ্ঠার শেষ লাইনে লেখা ছিল— “যাহা দিয়ারা ৩৯১৯ ও ৩৯২০ নং দাগ হইতে দখলভোগ করিবেন”। জমির আসল মালিকানা ও দখলের চাবিকাঠি ছিল এই অংশটুকুই। কিন্তু অপরাধচক্রটি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় অসৎ উদ্দেশ্যে ওই লাইনের ওপর সাদা ফ্লুইড দিয়ে ঘষে সম্পূর্ণ মুছে ফেলে। এরপর সেই পরিবর্তিত জাল দলিলটিকে বালামভুক্ত করে তাতে সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক স্বাক্ষরও সেরে ফেলা হয়। চক্রটির মূল লক্ষ্য ছিল দলিলের প্রকৃত গ্রহীতা মো. খলিলুর রহমানকে তাঁর প্রাপ্য প্রায় ৯ শতাংশ জমির দখল থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করা।
জমির প্রকৃত মালিক খলিলুর রহমানের অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনার অনুসন্ধানে মাঠে নামে দুদক। প্রাথমিক অনুসন্ধান ও তদন্তে নথিপত্র জালিয়াতির অকাট্য প্রমাণ মেলার পর, চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি (২০২৬) ফরিদপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সরদার আবুল বাসার বাদী হয়ে এই মামলা দায়ের করেন।
মামলায় কেবল সাবেক সাব-রেজিস্ট্রারই নন, এই জালিয়াতি সিন্ডিকেটের আরও চার সদস্যকে আসামি করা হয়েছে। তারা হলেন:মোঃমেহেদী হাসান (তুলনাকারক), মনোয়ার হোসেন (নকলকারক), মোঃ জাহিদ শেখ (পাঠক), মোঃ জিন্নাহ শেখ (দলিলের দাতা)
সরকারি ক্ষমতার চরম অপব্যবহার, অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ, জালিয়াতি এবং অন্যায্য আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অপরাধে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭ এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় একাধিক কঠোর অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, এই তদন্তের পরিধি এখানেই শেষ নয়। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের এই ‘ফ্লুইড সিন্ডিকেট’-এর পেছনে আর কোনো বড় কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তির অদৃশ্য হাত রয়েছে কিনা, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে নতুন কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলেই তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে দুদক।

শফিউল মঞ্জুর ফরিদঃ 



















