Dhaka , শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ:
Logo ডিএসইর লেনদেন ছাড়াল ৯৩৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা Logo বহিষ্কৃত এমপির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ইসিতে জামায়াতের চিঠি Logo শুক্রবার ভারতজুড়ে বিক্ষোভের ডাক সিজেপিয়ের, উত্তেজনা তুঙ্গে Logo মুগদা থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে ২২ জন গ্রেফতার Logo সেবামূলক কার্যক্রমে মানুষের আস্থার প্রতীক ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ Logo ভারতের শিক্ষার্থী আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে সরব শোবিজ অঙ্গন Logo সিআইএমএস ফরম পূরণ সপ্তাহে রামপুরা থানায় র‍্যালি ও সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত Logo সৌদি আরবের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন চুক্তি Logo ইনভেস্টরস এক্সপো পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী Logo প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে প্রথমবার শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা, জবাব রাহুল গান্ধী ও সিপিআইয়ের

আজ খুলনার চুকনগর গণহত্যা দিবস পালিত হচ্ছে

  • অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট এর সময় : ০৮:১৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬
  • ৯৯ বার দেখা হয়েছে

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে খুলনার চুকনগরের গণহত্যা এক কালো অধ্যায় রচনা করেছে। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনারা যে নির্মম অত্যাচার, নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, তারই এক নীরব সাক্ষী হয়ে আছে চুকনগর। সেই স্থানে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ বহন করছে বর্বরতার সেসব স্মৃতিচিহ্ন।

শুধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধই নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম যেসব গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে একটি চুকনগর গণহত্যা। ১৯৭১ সালের ২০ মে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন খুলনার ডুমুরিয়ার ছোট্ট গ্রাম চুকনগরে পাকিস্তানি সেনারা নির্মম এ হত্যাকাণ্ড চালায়। সরকারি পরিসংখ্যানে সেদিন ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। তবে স্থানীয়দের দাবি, সে সংখ্যা ২০ হাজারেরও বেশি হবে।

এদিকে, উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে চুকনগর গণহত্যা দিবস পালিত হবে। বধ্যভূমিতে মুক্তিযোদ্ধা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও বিশিষ্টজনকে সঙ্গে নিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও আলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সূত্রে জানা গেছে, ওই দিন যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের বেশিরভাগ পুরুষ হলেও বহু নারী ও শিশুকেও হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা। অনেক শিশু মায়ের বুকের দুধ খাচ্ছিল, সে অবস্থায়ই চলে ঘাতকের নির্মম বুলেট। বুলেট মায়ের বুকে বিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়েছেন মা; কিন্তু অবুঝ শিশু তখনো মায়ের স্তন মুখের মধ্যে রেখে ক্ষুধা নিবারণের ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। এমনই কত ঘটনা যে সেদিন ঘটেছিল, তার সঠিক ধারণা পাওয়া কঠিন।

হত্যাযজ্ঞ থেকে বাঁচতে অনেকে নদীতে লাফিয়ে পড়েন। তাদের অনেকেই ডুবে মারা যান। লাশের গন্ধে ভারী হয়ে যায় চুকনগর ও এর আশপাশের বাতাস। মাঠে, ক্ষেতে, খালে-বিলে পড়ে থাকে লাশ আর লাশ। বর্বর পাকিস্তানিদের নির্মম হত্যাযজ্ঞ শেষে এসব স্থান থেকে লাশ নিয়ে নদীতে ফেলার কাজ শুরু করেন স্থানীয়রা।

চুকনগরের ফসলি জমিগুলোয় আজও পাওয়া যায় সেদিনের শহীদদের হাড়গোড়, তাদের শরীরে থাকা বিভিন্ন অলংকার।

প্রত্যক্ষদর্শী আবুল কালাম মহিউদ্দিন সেদিনের নারকীয়তার বর্ণনা দিয়ে বাসস’কে বলেন, ১৯ মে রাত থেকে দাকোপ বটিয়াঘাটা, রূপসা, তেরোখাদা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরিশাল, গোপালগঞ্জসহ দক্ষিণ বঙ্গের সব এলাকা থেকে বানের স্রোতের মতো মানুষ চুকনগর আসতে থাকে। ভারতে আশ্রয় নেয়ার জন্য তারা সেদিন চুকনগর পাতোখোলা বিলসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে অবস্থান নেয়।

তিনি বলেন, বেলা ১১টার দিকে ২৫ থেকে ৩০ জন পাকিস্তানি সেনারা দু’টি গাড়িতে করে চুকনগর আসে। বর্তমান চুকনগর ডিগ্রি কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে মালতিয়ার সুরেন কুণ্ডুকে প্রথমে গুলি করে। তারপর গুলি করে চিকন মোড়ল নামে স্থানীয় আরেকজনকে। এরপর পাতোখোলা বিলে নেমে অতর্কিত ব্রাশ ফায়ার করতে থাকে। সেদিনের মানুষের আর্তনাদ আজো আমার কানে বাজে।

কালাম আরও বলেন, পাতোখোলা বিলে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী তিন ভাগ হয়ে আশপাশের গ্রামগুলোতে ঢুকে হত্যাযজ্ঞ চালায়। স্থানীয় মুসলমানরা জোরে জোরে কলেমা পড়ে পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলে বেঁচে গিয়েছিল সেদিন। তিন থেকে চার ঘণ্টা ধরে এই হত্যাযজ্ঞ চালায় তারা।

চুকনগর গণহত্যা স্মৃতি পরিষদের সভাপতি এবিএম শফিকুল ইসলাম বাসস’কে বলেন, আমার বয়স তখন ১৫-১৬ বছর। সকাল ৮টা নাগাদ সেদিন চুকনগর বাজারে আসি। আশপাশের কয়েক জেলা থেকে দুই লাখের মতো মানুষ সেদিন চুকনগর পাতোখোলার বিল, মন্দির, আশপাশের গ্রামগুলোতে অবস্থান নেয়। বেলা ১১টার দিকে পাকিস্তানি বাহিনী চুকনগর আসে এবং নির্মম গণহত্যা চালায়। সেদিন গুলির শব্দে কাঁপতে থাকে চুকনগরের আকাশ। মানুষ দিগি¦দিক ছুটতে থাকে বাঁচার জন্য। তিন থেকে চার ঘণ্টার হত্যাযজ্ঞে চুকনগর পরিণত হয় লাশের স্তূপে। বাজারের পাশে থাকা ভদ্রা নদীর পানি সেদিন ছিল লাল আর ভাসছিল হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষের নিথর দেহ।

মুক্তিযুদ্ধকালীন ডুমুরিয়ার কমান্ডার নুরুল ইসলাম মানিক বাসস’কে বলেন, ১৯৭১ সালের ২০ মে আমি ভারতে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিংয়ে ছিলাম। ভারতে আশ্রয় নেয়া মানুষের কাছ থেকে আমরা সেদিন এই নারকীয় তাণ্ডবের কথা জানতে পারি। প্রতিশোধের আগুন জ্বলতে থাকে বুকের ভেতর। জুন মাসের প্রথম দিকে আমরা ট্রেনিং শেষ করে ডুমুরিয়ায় আসি এবং পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করি।

ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার বাসস’কে জানিয়েছেন, প্রতি বছরের মতো এবারও যথাযোগ্য মর্যাদায় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে চুকনগর গণহত্যা দিবস পালিত হবে। বধ্যভূমিতে মুক্তিযোদ্ধা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও বিশিষ্টজনকে সঙ্গে নিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও আলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

About Author Information

জনপ্রিয় খবর

ডিএসইর লেনদেন ছাড়াল ৯৩৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা

আজ খুলনার চুকনগর গণহত্যা দিবস পালিত হচ্ছে

আপডেট এর সময় : ০৮:১৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে খুলনার চুকনগরের গণহত্যা এক কালো অধ্যায় রচনা করেছে। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনারা যে নির্মম অত্যাচার, নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, তারই এক নীরব সাক্ষী হয়ে আছে চুকনগর। সেই স্থানে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ বহন করছে বর্বরতার সেসব স্মৃতিচিহ্ন।

শুধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধই নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম যেসব গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে একটি চুকনগর গণহত্যা। ১৯৭১ সালের ২০ মে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন খুলনার ডুমুরিয়ার ছোট্ট গ্রাম চুকনগরে পাকিস্তানি সেনারা নির্মম এ হত্যাকাণ্ড চালায়। সরকারি পরিসংখ্যানে সেদিন ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। তবে স্থানীয়দের দাবি, সে সংখ্যা ২০ হাজারেরও বেশি হবে।

এদিকে, উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে চুকনগর গণহত্যা দিবস পালিত হবে। বধ্যভূমিতে মুক্তিযোদ্ধা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও বিশিষ্টজনকে সঙ্গে নিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও আলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সূত্রে জানা গেছে, ওই দিন যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের বেশিরভাগ পুরুষ হলেও বহু নারী ও শিশুকেও হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা। অনেক শিশু মায়ের বুকের দুধ খাচ্ছিল, সে অবস্থায়ই চলে ঘাতকের নির্মম বুলেট। বুলেট মায়ের বুকে বিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়েছেন মা; কিন্তু অবুঝ শিশু তখনো মায়ের স্তন মুখের মধ্যে রেখে ক্ষুধা নিবারণের ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। এমনই কত ঘটনা যে সেদিন ঘটেছিল, তার সঠিক ধারণা পাওয়া কঠিন।

হত্যাযজ্ঞ থেকে বাঁচতে অনেকে নদীতে লাফিয়ে পড়েন। তাদের অনেকেই ডুবে মারা যান। লাশের গন্ধে ভারী হয়ে যায় চুকনগর ও এর আশপাশের বাতাস। মাঠে, ক্ষেতে, খালে-বিলে পড়ে থাকে লাশ আর লাশ। বর্বর পাকিস্তানিদের নির্মম হত্যাযজ্ঞ শেষে এসব স্থান থেকে লাশ নিয়ে নদীতে ফেলার কাজ শুরু করেন স্থানীয়রা।

চুকনগরের ফসলি জমিগুলোয় আজও পাওয়া যায় সেদিনের শহীদদের হাড়গোড়, তাদের শরীরে থাকা বিভিন্ন অলংকার।

প্রত্যক্ষদর্শী আবুল কালাম মহিউদ্দিন সেদিনের নারকীয়তার বর্ণনা দিয়ে বাসস’কে বলেন, ১৯ মে রাত থেকে দাকোপ বটিয়াঘাটা, রূপসা, তেরোখাদা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরিশাল, গোপালগঞ্জসহ দক্ষিণ বঙ্গের সব এলাকা থেকে বানের স্রোতের মতো মানুষ চুকনগর আসতে থাকে। ভারতে আশ্রয় নেয়ার জন্য তারা সেদিন চুকনগর পাতোখোলা বিলসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে অবস্থান নেয়।

তিনি বলেন, বেলা ১১টার দিকে ২৫ থেকে ৩০ জন পাকিস্তানি সেনারা দু’টি গাড়িতে করে চুকনগর আসে। বর্তমান চুকনগর ডিগ্রি কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে মালতিয়ার সুরেন কুণ্ডুকে প্রথমে গুলি করে। তারপর গুলি করে চিকন মোড়ল নামে স্থানীয় আরেকজনকে। এরপর পাতোখোলা বিলে নেমে অতর্কিত ব্রাশ ফায়ার করতে থাকে। সেদিনের মানুষের আর্তনাদ আজো আমার কানে বাজে।

কালাম আরও বলেন, পাতোখোলা বিলে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী তিন ভাগ হয়ে আশপাশের গ্রামগুলোতে ঢুকে হত্যাযজ্ঞ চালায়। স্থানীয় মুসলমানরা জোরে জোরে কলেমা পড়ে পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলে বেঁচে গিয়েছিল সেদিন। তিন থেকে চার ঘণ্টা ধরে এই হত্যাযজ্ঞ চালায় তারা।

চুকনগর গণহত্যা স্মৃতি পরিষদের সভাপতি এবিএম শফিকুল ইসলাম বাসস’কে বলেন, আমার বয়স তখন ১৫-১৬ বছর। সকাল ৮টা নাগাদ সেদিন চুকনগর বাজারে আসি। আশপাশের কয়েক জেলা থেকে দুই লাখের মতো মানুষ সেদিন চুকনগর পাতোখোলার বিল, মন্দির, আশপাশের গ্রামগুলোতে অবস্থান নেয়। বেলা ১১টার দিকে পাকিস্তানি বাহিনী চুকনগর আসে এবং নির্মম গণহত্যা চালায়। সেদিন গুলির শব্দে কাঁপতে থাকে চুকনগরের আকাশ। মানুষ দিগি¦দিক ছুটতে থাকে বাঁচার জন্য। তিন থেকে চার ঘণ্টার হত্যাযজ্ঞে চুকনগর পরিণত হয় লাশের স্তূপে। বাজারের পাশে থাকা ভদ্রা নদীর পানি সেদিন ছিল লাল আর ভাসছিল হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষের নিথর দেহ।

মুক্তিযুদ্ধকালীন ডুমুরিয়ার কমান্ডার নুরুল ইসলাম মানিক বাসস’কে বলেন, ১৯৭১ সালের ২০ মে আমি ভারতে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিংয়ে ছিলাম। ভারতে আশ্রয় নেয়া মানুষের কাছ থেকে আমরা সেদিন এই নারকীয় তাণ্ডবের কথা জানতে পারি। প্রতিশোধের আগুন জ্বলতে থাকে বুকের ভেতর। জুন মাসের প্রথম দিকে আমরা ট্রেনিং শেষ করে ডুমুরিয়ায় আসি এবং পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করি।

ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার বাসস’কে জানিয়েছেন, প্রতি বছরের মতো এবারও যথাযোগ্য মর্যাদায় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে চুকনগর গণহত্যা দিবস পালিত হবে। বধ্যভূমিতে মুক্তিযোদ্ধা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও বিশিষ্টজনকে সঙ্গে নিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও আলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।